কিট সংকটে ব্যাহত টেস্ট

0
26
কিট সংকটে ব্যাহত টেস্ট
Search and buy domains from Namecheap


দেশে করোনা শনাক্তকরণে টেস্টিং কিটের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় পরীক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিট সংকটের কারণে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক সন্দেহভাজন রোগী উপসর্গ থাকলেও পরীক্ষা করাতে পারছেন না। এতে করোনা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিটের অভাবে প্রতিদিনই বন্ধ রাখতে হচ্ছে ৪-৫টি ল্যাব। অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাবি, দেশে কিটের কোনো সংকট নেই। ল্যাবরেটরি ফ্যাসিলিটি ও জনবল বাড়ানো হলে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়বে।

জানা গেছে, দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। ওই সময়ে একটি মাত্র ল্যাবেরেটরিতে করোনা পরীক্ষা করা হতো। সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে থাকায় মার্চ মাসের শেষ দিকে ল্যাবের সংখ্যা বাড়াতে থাকে সরকার। দেশে বর্তমানে ৬৬টি ল্যাবরেটরিতে করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণ পরীক্ষা হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩৫টি এবং ঢাকার বাইরে ৩১টি। এসব ল্যাবে প্রতিদিন যে পরিমাণ নমুনা পরীক্ষা করার সক্ষমতা রয়েছে, সেই পরিমাণ পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। কিট সংকট ও দক্ষ জনবলের অভাবে ল্যাবগুলোর পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭ হাজার ৯৯৯ জনের করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে, যা এ পর্যন্ত একদিনে সর্বোচ্চ পরীক্ষা।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর হোসেন বলেন, দেশের অনেক ল্যাবে একটি করে মেশিন রয়েছে। একটি মেশিনে এক শিফটে ৯২টি নমুনা পরীক্ষা করা যায়। দুই বা তিন শিফট পর্যন্ত কাজ করা গেলে প্রায় ৩০০ নমুনা পরীক্ষা সম্ভব। আর যেসব ল্যাবে একাধিক মেশিন সেখানে পরীক্ষার সংখ্যা বেশি হবে। কিন্তু ল্যাবগুলোয় নমুনা জমা পড়ে তা থেকে অনেক বেশি। এখন পরীক্ষার চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে রিপোর্ট পেতে ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে এর চেয়েও বেশি সময় লাগছে। আবার অনেক সময় মেশিনে একটু সমস্যা দেখা দিলে সেদিন কাজ বন্ধ, তখন নমুনা জমা হয়ে যায়।

দেশে প্রথমে ল্যাবরেটরি ছিল মাত্র একটি আইইডিসিআর।

রোগী বেড়ে যাওয়ায় বিশেষজ্ঞদের সমালোচনার মুখে মার্চ মাসের শেষ দিকে ল্যাবরেটরির সংখ্যা বাড়ানো শুরু করে সরকার। বর্তমানে দেশে ৬৬টি ল্যাব রয়েছে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ২১ জেলায় ল্যাবরেটরি চালু আছে, বাকি ৪৩টি জেলায় ল্যাব নেই। যে জেলায় ল্যাবরেটরি নেই সেসব জেলা-উপজেলার নমুনা সংগ্রহের পাঠানো হয় পার্শ্ববর্তী ল্যাবরেটরি বা ঢাকার ল্যারবেটরিতে। দেশে বর্তমানে যেসব পিসিআর ল্যাব সেগুলোতে প্রয়োজনীয় কিট ও দক্ষ জনবল থাকলে প্রতিদিন ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু প্রতিদিন পরীক্ষা হচ্ছে ১৫ থেকে ১৬ হাজার। এমনিতেই কিট সংকটে কারণে পরীক্ষা কম হচ্ছে। তার পরে আবার প্রতিদিন ৪-৫টি ল্যাব থাকে বন্ধ এবং কিছু ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা ২টি থেকে ১০০টির নিচে। ফলে ল্যাবগুলোয় সংগৃহীত নমুনা জট বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত এক সপ্তাহের পরীক্ষার পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৯ জুন দুপুর থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত মোট নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ৯৭ হাজার ২৭২টি। এর মধ্যে পরীক্ষা হয়েছে ৭৮ হাজার ৩০৭টি নমুনা। বর্তমানে পরীক্ষায় অপেক্ষায় পড়ে আছে ১৮ হাজার ৯৬৫টি নমুনা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশের ৬৬টি ল্যাবরেটরির মধ্যে গেল ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার তিনটি ও ঢাকার বাইরে দুইটি ল্যাবসহ মোট পাঁচটি ল্যাবে কোনো পরীক্ষা হয়নি। একই সময় ঢাকার ডা. লাল প্যাথ ল্যাবস বাংলাদেশ লিমিটেডে ২টি, দ্য ডিএনএ ল্যাব লিমিটেডে ৬৭টি, বায়োমেড ডায়াগনস্টিকে ৯২টি, গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৮২টি, চট্টগ্রামের ইমপেরিয়াল হাসপাতালে ৯৫টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় ছয়টি ল্যাবে কোনো পরীক্ষা হয়নি এবং একটি ল্যাবে ৪০টি, একটিতে ৪১টি, একটিতে ৫৬টি, একটিতে ৭৪টি, একটি ৮২টি একটিতে ৯০টি, একটি ৯৪টি এবং একটিতে ৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় পাঁচটি ল্যাব বন্ধ ছিল এবং একটি ল্যাবে ১৩টি, একটিতে ৪০টি, একটিতে ৯৫টি, একটিতে ৮০টি এবং ৯৪টি পরীক্ষা হয়েছে। বাকি ল্যাবগুলোয় ১০০টি থেকে শুরু করে ২ হাজার ৬০০ বেশি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এটি হচ্ছে ল্যাবের নমুনা পরীক্ষার চিত্র।

করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যে গঠিত ১৭ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি’ গঠন করে সরকার। কমিটি দেশের করোনা ভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের বিষয়ে করণীয় নিয়ে গত ২৮ এপ্রিল বৈঠক করে। বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা শেষে ও পূর্ববর্তী পাঁচটি সাব-কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আটটি সুপারিশ তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। তার একটি সুপারিশ ছিলÑ করোনা রোগী শনাক্ত করতে টেস্টের সংখ্যা ও স্থান আরও বাড়ানো। একই সঙ্গে করোনা টেস্টের জন্য স্বল্প সময়ে ৫ লাখ টেস্টিং কিট সংগ্রহ করার সুপারিশ করে। কিন্তু টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সেই সুপারিশ গুরুত্ব সহকারে আমলে নেয়নি সরকার। এ কারণে মাঝে মধ্যে কিটের সংকট পড়ে। পরীক্ষার সংখ্যা ১৫-১৬ হাজারে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বিএসএমএমইউর সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, পিসিআর মেশিন একবার রান করলে ৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করা যায়। নমুনা পরীক্ষার জন্য আমরা এপ্রিল মাসের শেষ দিকে ৫ লাখ কিট সংগ্রহের সুপারিশ করেছি।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ও জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান গণমাধ্যমকে বলেছেন, মাল্টিপল সোর্স থেকে কিট সংগ্রহ করতে হবে। সিঙ্গেল সোর্স থেকে কিট সংগ্রহ করা হলে এই সমস্যা থাকবে।

কিট সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে চীন বিশেষজ্ঞ দল দেশে ফেরার সময় ঢাকার বিমানবন্দরে বিদায়ী অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের লাখ লাখ কিটের অর্ডার দেওয়া আছে। কিন্তু তারা দেয় ছোট ছোট লটে। যার ফলে অনেক সময় আমাদের স্টকে কিটের ঘাটতি পড়ে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আমাদের সময়কে বলেছেন, দেশে কোভিড পরীক্ষার কিটের কোনো সংকট নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে ৬৯ হাজার কিট মজুদ আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ল্যাবরেটরি পাঠানো ৩১ হাজার কিট রয়েছে। এ ছাড়া গতকাল বৃহস্পতিবার আরও ৬৫ হাজার কিট এসেছে। সব মিলিয়ে ১ লাখ ৬৫ হাজার কিট আছে। কিট নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কিটের সমস্যার কারণে পরীক্ষা কম হচ্ছে তা নয়। ল্যাবে যারা কাজ করেন তাদেরও রেস্ট দিতে হয়। ল্যাবরেটরি ফ্যাসিলিটি ও জনবল বাড়লে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়বে। আমরা আরটি-পিসিআর ল্যাবরেটরি ফ্যাসিলিটি বাড়ানোর প্রচেষ্টা নিয়েছি। সারা দেশের ৬৪টি জেলায় ল্যাব স্থাপন করব। করোনা টেস্ট সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেব। যাদের প্রয়োজন তারা যেন ল্যাবে গিয়ে টেস্ট করাতে পারেন।

জানা গেছে, দেশটিতে সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় দেশের সব জেলায় ল্যাবেরেটরি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। কিন্তু কিট স্বল্পতা ও দক্ষ জনবলের অভাবে ইতোমধ্যে স্থাপিত ল্যাবগুলোয় পরীক্ষা করা হচ্ছে। দেশে ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষার টার্গেট করা হলেও এখন ১৬ বা ১৭ হাজারের মধ্যে তা সীমাবদ্ধ থাকছে।

করোনা শনাক্তকরণ কাজে সরকারের সাথে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। সংস্থটি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৫৪টি বুথ বসিয়ে নমুনা সংগ্রহ করছে। এসব বুথ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্র্যাকের কর্মকর্তা মোর্শেদা চৌধুরী একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ল্যাবের পাশাপাশি কিটের সংকটের কারণে এখন নমুনা সংগ্রহ কমানো হয়েছে। আমাদের প্রতিটি বুথে প্রতিদিন ৩০টি করে নমুনা সংগ্রহ করা হতো। এটা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকেই বেঁধে দেওয়া হয় একটা সংখ্যা। কারণ হচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক নমুনা আমাদের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করার ক্ষমতা আছে। এখন যেটা হয়েছে, এই সপ্তাহে আমাদের বলা হয়েছে আমরা যেন নমুনা সংগ্রহ একটু কম করি। কারণ কিটের একটু স্বল্পতা আছে। তিনি আরও বলেছেন, সে জন্য এই সপ্তাহে আমরা অর্ধেক করে নমুনা সংগ্রহ করছি অর্থাৎ ৩০টার জায়গায় ১৫টা। এ ছাড়া করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণ ল্যাবে ঝুঁকি থাকে। ল্যাবও সংক্রমিত হয়ে যায়। তখন সেই ল্যাব কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখতে হয়। সে জন্য অন্য ল্যাবের ওপর একটা চাপ তৈরি হয়।



Source link

Shared Hosting with Namecheap

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here