Homeখেলাঘুরে এলাম খালিয়াজুড়ির হাওর

ঘুরে এলাম খালিয়াজুড়ির হাওর


বাংলাদেশের অপরূপ সৌন্দর্যের প্রাকৃতিক লীলাভূমি হলো হাওর। বর্ষাকালে হাওরে থাকে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি। আবার শুকনো মৌসুমে নয়নজুড়ানো সোনালি সবুজ ধানের ক্ষেতে চারদিক অপরূপ হয়ে ওঠে। ঠিক করলামÑ এবার সবাই মিলে খালিয়াজুড়ি বিশাল হাওর দেখতে যাব। ২৯৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে রয়েছে প্রায় ৮৫টি গ্রাম। সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার লোকের বসবাস। খালিয়াজুড়ি উপজেলায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাই একমাত্র যানবাহনের মাধ্যম। এখানে অধিকাংশ মানুষের জীবিকা কৃষি ও মৎস্যনির্ভর। বর্ষাকালে জীবিকার প্রধান উৎস মাছ চাষ ও মাছ আহরণ করা। শুকনো মৌসুমে ব্যাপক ধানের ফলন হয়। একই সঙ্গে চরে শীত মৌসুমে মিষ্টিকুমড়া, বাদাম, মরিচ, টমেটো, সরিষা, সূর্যমুখীসহ প্রচুর রবিশস্যের আবাদ হয়। নেত্রকোনা জেলা থেকে মোহনগঞ্জ হয়ে যেতে হয় খালিয়াজুড়ি হাওরের প্রসিদ্ধ বোয়ালীঘাটে। মোহনগঞ্জ থেকে বোয়ালীর দূরত্ব প্রায় ২২ কিলোমিটার।

সবাই আনন্দের আমেজে ভ্রমণের জন্য তৈরি হলাম। সকাল ৯টায় মোহনগঞ্জ সদর থেকে খালিয়াজুড়ি হাওর দেখার উদ্দেশে রওনা হলাম। বৃষ্টিতে তৃষিত মাটি যেন সিক্ত হয়ে আছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ ভেসে আসছে। সবুজ শস্যক্ষেত, সজীব পাতায় ভরা বৃক্ষরাজি, শাপলা ফুলে ভরা টলমলে জলাধার, কচুরিপানার সাদা-বেগুনি রঙের কারুকাজ করা ফুল, রাস্তার দুইধারে শুকাতে দেওয়া ঢেউ খেলানো পাটের দড়ি, কদম ফুলে সজ্জিত গাছ, প্রকৃতির ছড়িয়ে থাকা অফুরন্ত অপূর্ব শোভা দেখতে দেখতে বোয়ালীঘাটে পোঁছাই। এখানে এসে পৌঁছাতে সময় লেগেছে প্রায় ৩০ মিনিট। বোয়ালীঘাটে এসে ইঞ্জিনচালিত জলযানে হাওরযাত্রা শুরু করি। পাড় ঘেঁষে প্রাণশক্তিতে ভরপুর ভাসমান কলমিলতা গাছে অসংখ্য বেগুনি রঙের ফুল বেশ নজর কাড়ে। আবহাওয়া এখন অনেকটাই ভালো। বৃষ্টি¯œাত দিন। কোমল রোদ। ঢেউয়ের বাঁকে বাঁকে যেন গহিনের নিঃশব্দ ধ্বনি। হাওরের মাঝামাঝি পৌঁছে দেখি, সে এক বিশাল জলরাশি। অনেকটা সমুদ্রের মতো। থই থই পানি। নীল আকাশটা যেন মায়াময় নীল আঁচল দিয়ে হাওরাঞ্চলে ঢেকে রেখেছে। ছোট ছোট কুটিরে ঘেরা গ্রামগুলো অনেকটা দ্বীপের মতো ভেসে আছে। ঝাঁকে ঝাঁকে হাঁসের জলকেলি। নৌকা, স্পিডবোট, ট্রলারে লোকজন বেশ আনন্দ নিয়ে হাওরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। উচ্ছ্বসিত হাওরে বোয়ালী পার হয়ে রোয়াইল নামক বিল ও আশাখালী বাঁধ পার হয়ে বয়ে চলেছে ধনু নদী। হাওরপাড়ের মানুষকে অনেক জীবন সংগ্রামের মাধ্যমে জীবন পার করতে হয়। বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টির সঙ্গে তাদের যুদ্ধ করতে হয়। নদীভাঙনের মতো প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। আবার হাওরে যখন পানি আসে, উচ্ছ্বাসে হাওরাঞ্চল আনন্দমুখর হয়ে ওঠে। অন্যদিকে পানি নেমে গেলে উর্বরভূমিতে সোনালি ফসল নিয়ে কৃষক-কৃষাণীর মুখ হাসিতে ভরে ওঠে। জানতে পারি, ধনু নদীর দুইতীরে প্রতিবছর প্রচুর রবিশস্য উৎপাদিত হয়। এখানে লেপসিয়া নামক বড় একটি বাজার আছে। জমজমাট এ বাজারটি প্রতিশনিবারে বসে। তখন সহ¯্রাধিক ইঞ্জিনচালিত নৌকার যাতায়াত হয়।

লেপসিয়া থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে বল্লী নামক গ্রামের রানীচাপুর বিল পর্যন্ত বয়ে গেছে পিয়াই নামক আরেকটি নদী। বর্ষা মৌসুমে এখানে জলযানই একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। তাকিয়ে দেখি, হাওরপাড়ের প্রায় প্রতিটি বাড়ির সঙ্গেই নৌকা ভেড়ানো আছে। আবার অনেক বাড়ির সঙ্গে ঘাট বাঁধানো আছে। ওই ঘাটে গৃহস্থালি জিনিসপত্রের ধোয়ার কাজ চলছে। গাছের শীতল ছায়ায় অনেকে দলবেঁধে গল্প করছে। গ্রামের গৃহবধূরা কলসি কাঁধে হেঁটে চলেছেন।

মাছ সংগ্রহ করছে পরিশ্রমী জেলেদের দল। সাহসী মাঝি বিশাল হাওরের ঢেউয়ের মধ্যেও কী সহজভঙ্গিতে নৌকা চালিয়ে যাচ্ছেন! চঞ্চল বালক আর কিশোরের দল সাঁতার কেটে হাওর মাতিয়ে রেখেছে। হাওরজুড়ে চলছে পানকৌড়ি আর সারসের অবাধ বিচরণ। কিছুক্ষণ পর পরই ঝাঁকবেঁধে ধবধবে সাদা বক উড়ে চলেছে দূর আকাশে। বকগুলো লম্বা গলা বাড়িয়ে ডানা মেলে অনেকটা বোয়িং বিমানের মতো উড়ে চলেছে। আবার বারবার ধূসর বকেরও দেখা মেলে। চারদিকে গ্রামবাংলার সহজ-সরল জীবনযাপনের রূপ ফুটে উঠেছে। সবাই গল্প করতে করতে ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করতে থাকি। একই সঙ্গে চলছে চিপস আর বাদাম খাওয়া। মোবাইল ফোনে ছবি তোলা তো চলছেই। চলার পথে দেখি, বিশাল হাওরের মাঝখানে শুধু একটা বড় গাছ দাঁড়িয়ে আছে। পানির ওপর সবুজ পাতায় ভরা ডালপালা ছড়ানো। কা- প্রায় পুরোটাই পানির নিচে। আশপাশে আর কোনো গাছ নেই। গাছটি যেন এক পায়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে হাওরকে পাহারা দিয়ে চলেছে। শুধু একটা গাছ যে হাওরের সৌন্দর্য অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে, তা এ দৃশ্যটা দেখেই বোঝা যায়। দৃশ্যটির ছবি মোবাইল ফোনে ধারণ করি। নীল আকাশের নিচে সাদা পানির ওপর সবুজ একটা গাছ। চমৎকার ছবি। সামনে এগিয়ে চলি। কোথাও বা একসঙ্গে অনেক গাছ পানির ওপর মাথা জাগিয়ে আছে। বোঝাই যায়, এগুলো ডুবে থাকা রাস্তার দুইপাশে লাগানো গাছের সারি। স্বচ্ছ সুনীল আকাশে হালকা সাদা, ধূসর মেঘের ওড়াউড়ি। বেলা দ্বিপ্রহর চলছে। সূর্যের আলোয় আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। রুপালি সূর্যের প্রতিবিম্বে হাওর চিকচিক করছে। রোদের উজ্জ্বলতায় ঝকঝকে হয়ে আছে পুরো হাওর। বয়ে চলেছে ঝিরিঝিরি বাতাস। আলোময় চারদিক। খেয়ালি ছন্দময় ঢেউ যেন উজ্জ্বলতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ধীরে ধীরে আবার বোয়ালীঘাটে এসে পৌঁছাই। সারাদিন হাওর আর হাওরপাড় ঘুরে হাওরবাসীর যে আন্তরিকতা দেখেছি, তা আমাদের অনেক অনেক মুগ্ধ করেছে। ভালো লাগার আমেজ নিয়ে চমৎকার হাওর ভ্রমণ করে সবাই খুব উচ্ছ্বসিত। একরাশ আনন্দ নিয়ে দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার তাগিদে আবার সবাই ছুটে চলি গন্তব্যস্থলে। পেছনে তাকিয়ে নীরব সন্ধ্যায় ডুবে যাওয়া হাওরের দিকে চেয়ে থাকি। হাওর যেন সবাইকে তার অবারিত রূপ দেখার নিমন্ত্রণ জানিয়ে নিরবধি ঢেউয়ের মনোমুগ্ধকর দোলা পাড়ে এসে যেন সৌন্দর্যের দ্বার খুলে রেখেছে। উজ্জ্বল হাওরাঞ্চল ভ্রমণের এই নৈসর্গিক স্মৃতি আমাদের সবার চৈতন্যে অম্লান হয়ে থাকবে।





Source link

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments